সওজে ভয়াবহ অনিয়ম, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য Advertisement
আপলোড সময় :
২৩-০২-২০২৬ ০২:২৩:৩০ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
২৩-০২-২০২৬ ০২:২৩:৩০ পূর্বাহ্ন
ঠিকাদার কাজই শুরু করেননি, অথচ অফিশিয়াল নথিতে দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ এবং সেই কাজের বিপরীতে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে—এমন চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ে। অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রস্তুত করা এসব নথি অভিজ্ঞতাপত্র হিসেবে ব্যবহার করে টাঙ্গাইল ও জামালপুরে একাধিক বড় ঠিকাদারি কাজের দরপত্রে অংশ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, চয়ন অ্যাসোসিয়েটস নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আহলান সুমন তালুকদারের পক্ষে এই জালিয়াতি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি টাঙ্গাইল ও জামালপুরে ১৭টি ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের দরপত্রে অংশ নিতে ফরিদপুর অঞ্চলের চারটি ব্রিজে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়। বাস্তবে ওই চারটি ব্রিজে রেট্রোফিটিংয়ের কাজ শুরুই হয়নি।
চয়ন অ্যাসোসিয়েটস টাঙ্গাইল রোড ডিভিশনের আওতায় ১৬টি এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ–বাহাদুরঘাট মহাসড়কের বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সমর ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের দরপত্রে অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা বাড়াতে সওজ ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা ভুয়া তথ্য সংযুক্ত করেন।
দরপত্রের নথিপত্রে বিল পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে সিএমএস (সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) দাখিল করা হয়। সরকারি কাজে সিএমএস হচ্ছে বিল পরিশোধের অফিশিয়াল ডকুমেন্ট। এতে স্বাক্ষর করেন সওজ ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুর রহমান এবং সহকারী প্রকৌশলী এস এম রফিকুল ইসলাম।
দাখিলকৃত সিএমএসে উল্লেখ করা হয়, ভাঙ্গা–ফরিদপুর সড়কের মাধবপুর, পুখুরিয়া, বাসাগাড়ি ও মানিকনগর নামে পরিচিত চারটি ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের বিপরীতে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসকে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়কে পিচ ঢালাই ও মেরামতের কাজ চললেও চারটি ব্রিজে রেট্রোফিটিংয়ের মূল কাজ শুরু হয়নি। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী ওই চার ব্রিজে রেট্রোফিটিংয়ের জন্য ১২ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকার একটি প্রস্তাব তৈরি করেন। দরপত্রে চয়ন অ্যাসোসিয়েটস ও ইলেকট্রিক লিমিটেড যৌথভাবে (জয়েন্টভেঞ্চার) ১০ শতাংশ কম দর দিয়ে ১১ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭৪ টাকায় কাজটি সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেয়।
১৭ নভেম্বর সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ওই যৌথ প্রতিষ্ঠানকে কাজের যোগ্য ঘোষণা করে একই দিনে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে কাজটি ২০২৭ সালের ১১ মের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দেড় মাসে কেবল ব্রিজের নিচে গজিয়ে ওঠা গাছগাছালি পরিষ্কার করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পের শুরুতেই ৭০ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধের সিএমএস তৈরি করা হয়।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হল, কাজটি যৌথভাবে পেলেও প্রথম বিলের সিএমএস ইস্যু করা হয়েছে শুধু চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের নামে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার বলেন, ‘আসলে ৭০ শতাংশ বিল পরিশোধের কোনো সিএমএস দেওয়া হয়নি। টাঙ্গাইল ও জামালপুরের কর্মকর্তারা যাচাইয়ের সময় নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন করলে জানিয়ে দেওয়া হবে, এগুলো সঠিক নয়।’
তবে ফরিদপুর সওজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা সিএমএসে স্বাক্ষর করেছেন। বিষয়টি অস্বীকারের সুযোগ নেই। ফরেনসিক পরীক্ষায় স্বাক্ষরের সত্যতা প্রমাণ হবে। ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন অস্বীকার করা হচ্ছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের ১৭টি ব্রিজের কাজ পাইয়ে দিতেই এই জালিয়াতি করা হয়েছে। এর সঙ্গে সওজের গোপালগঞ্জ জোনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও জড়িত।
অভিযোগ প্রসঙ্গে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের মালিক আহলান সুমন তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো মিথ্যা তথ্য দরপত্রে দাখিল করিনি।’ তিনি দাবি করেন, সওজের রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিকরুল হাসান তার মামা নন এবং সেই পরিচয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টাও করেননি।
তবে পরদিনই জালিয়াতির বিষয় স্বীকার করে ঠিকাদারের পক্ষে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রতিবেদকের কাছে ক্ষমা চান। তিনি নিজেকে ২০১৮ সালে একটি ছাত্র সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পরিচয় দিয়ে বলেন, গত ১৫ বছর তারা কোনো দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি। চলমান দরপত্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ফরিদপুরের চারটি ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের ৭০ শতাংশ বিল পরিশোধের ভুয়া সিএমএস তৈরি করা হয়। একপর্যায়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
প্রকৌশলীদের ভাষায়, পুরোনো ব্রিজ বা ভবন না ভেঙে শক্তিশালী করার সংস্কারমূলক প্রক্রিয়াকে রেট্রোফিটিং বলা হয়। এতে পুরোনো স্ট্রাকচার অক্ষুণ্ন রেখে অতিরিক্ত লোড নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হয়। এই কাজের জন্য অভিজ্ঞ ঠিকাদার ও দক্ষ প্রকৌশলী অপরিহার্য।
সওজের এক কর্মকর্তা বলেন, রেট্রোফিটিংয়ের কাজগুলো দীর্ঘদিন ধরেই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় ধরে প্রকল্প অনুমোদন করা হয় এবং ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের মধ্যে সমঝোতায় ভাগাভাগি চলে। বিগত সরকারের সময়ে এসব কাজকে ‘নেতাকর্মী লালন-পালন কর্মসূচি’ বলা হতো।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগেও দরপত্রের নথিপত্র জালিয়াতির অভিযোগে প্রায় ৭০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ এখনো দরপত্রে অংশ নিতে পারছে না।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স